প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির মহাকাব্যে ১৯০০ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব—প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আজ দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন ১১ দলীয় জোট 'ঐক্যের সরকার' গঠনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তখন মাঠপর্যায়ে সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পটুয়াখালী-০৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের নির্বাচনী মাঠ।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের হাত ধরে যে রাজনৈতিক চেতনার জন্ম, তা ১৯৪৭-এর দেশভাগ হয়ে ১৯৭১-এর স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর নির্বাচনে আমরা ক্ষমতার পালাবদল দেখেছি। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক পরিবর্তন এনেছে, যেখানে তরুণ নেতৃত্বই এখন মূল আলোচনার কেন্দ্রে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা।
পটুয়াখালী-০৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ও দলটির সভাপতি নুরুল হক নুরকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬) বরিশালের সিভিল জজ সাব্বির মো. খালিদ এই নোটিশ জারি করেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নুর তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। এছাড়া গত ২৬ জানুয়ারি দশমিনার চরবোরহান এলাকায় হাসান মামুনের নির্বাচনী অফিসে নুরের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে পটুয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সশরীরে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে উপস্থিত হয়ে নুরকে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে যখন নুরের মতো তরুণ নেতারা আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে 'তৃতীয় শক্তি'র সম্ভাবনা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম কারিগর মাহফুজ আলম এনসিপিতে যোগ না দেওয়ার কারণ হিসেবে এনসিপির 'জামায়াত-নির্ভরতা'কে দায়ী করেছেন। মাহফুজ আলমের মতে, মানুষ একটি পরিচ্ছন্ন তৃতীয় শক্তি চেয়েছিল, কিন্তু এনসিপি ১১ দলীয় জোটে যাওয়ায় সেই প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে।
অন্যদিকে, ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কুমিল্লার সমাবেশে ঘোষণা করেছেন, তারা বিজয়ী হলে পরাজিতদের নিয়েও সরকার গঠন করবেন। ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া এ দেশের রাজনীতিতে 'পরাজিতদের নিয়ে সরকার' গঠনের এমন প্রস্তাব বেশ নজিরবিহীন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ বা আধিপত্য দেখতে চাই না। ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ই হবে ১১ দলের বিজয়।" তবে আসিফ মাহমুদের মতো নেতারা অভিযোগ করছেন যে, এখনো রাজনীতিতে 'মিডিয়া ট্রায়াল' এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের সংস্কৃতি রয়ে গেছে। আসিফ মাহমুদ তার ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক জবাব দিতে না পেরে ব্যক্তিগত আক্রমণ করাটা হীনম্মন্যতার পরিচয়।
১৯০০ সালে যে রাজনীতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন বড় ধরনের ঐক্য ও সংহতির ডাক দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোতে বাড়ছে রাজনৈতিক সংঘাত। নুর কি পারবেন তার আইনি বাধা কাটিয়ে নির্বাচনী দৌড়ে টিকে থাকতে? নাকি মাহফুজ আলমের আশঙ্কা অনুযায়ী নতুন জোটের ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমতে শুরু করবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর।
সূত্র: বরিশালের নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির নোটিশ কপি, ডা. শফিকুর রহমানের জনসভার বক্তব্য, মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের সাক্ষাৎকার ও ফেসবুক পোস্ট, এবং জাতীয় আর্কাইভ।
বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনপূর্ব আচরণবিধি লঙ্ঘন ও হামলা-মামলা নতুন কিছু নয়। ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ার কথা ছিল। জুলাই বিপ্লবের পর যেখানে একটি স্বচ্ছ ও অহিংস নির্বাচনের দাবি উঠেছিল, সেখানে পটুয়াখালীর ঘটনা এবং তরুণ নেতাদের মধ্যে বিভাজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। ১১ দলীয় জোটের 'ঐক্যের সরকার' গঠনের প্রস্তাবটি যেমন আশাব্যঞ্জক, মাঠের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |